Skip to content

ইউআরএস / পিসিএনএল (ক্যামেরা ও লেজার দিয়ে কিডনি ও মূত্রনালীর পাথর ভাঙা)

ইউআরএস / পিসিএনএল (ক্যামেরা ও লেজার দিয়ে কিডনি ও মূত্রনালীর পাথর ভাঙা)
Rate this post

কিডনি বা মূত্রনালীতে পাথর ধরা পড়লে অনেকের মনেই প্রথম প্রশ্ন আসে—অপারেশন ছাড়া কি উপায় নেই? আধুনিক চিকিৎসায় ক্যামেরা ও লেজার দিয়ে পাথর ভাঙার দুটি প্রধান পদ্ধতি আছে: ইউআরএস (ইউরেটেরোস্কোপি) এবং পিসিএনএল (পারকিউটেনিয়াস নেফ্রোলিথোটমি)। পাথরের আকার, অবস্থান ও ঘনত্বের উপর নির্ভর করে চিকিৎসক নির্ধারণ করেন কোন পদ্ধতি আপনার জন্য উপযুক্ত। নিচে দুটি পদ্ধতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো।

Table of Contents

ইউআরএস কী? ক্যামেরা ও লেজার দিয়ে কীভাবে পাথর ভাঙা হয়?

ইউআরএস (Ureterorenoscopy) একটি ন্যূনতম আক্রমণাত্মক পদ্ধতি, যেখানে মূত্রনালীর ভেতর দিয়ে একটি পাতলা ক্যামেরাযুক্ত টিউব (ইউরেটেরোস্কোপ) প্রবেশ করানো হয়। ক্যামেরার মাধ্যমে পাথর দেখার পর লেজার (সাধারণত Holmium:YAG) ব্যবহার করে পাথরকে ছোট ছোট টুকরো বা গুঁড়ো করে ফেলা হয়। এই পদ্ধতিটি সাধারণত ছোট থেকে মাঝারি আকারের (২ সেন্টিমিটারের কম) মূত্রনালী বা কিডনির নিচের অংশের পাথরের জন্য ব্যবহৃত হয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে এটি ডে-কেয়ার পদ্ধতি, অর্থাৎ রোগী একই দিনে বা পরের দিন বাড়ি ফিরতে পারেন।

পিসিএনএল কী? বড় পাথরের জন্য কেন এটি বেশি কার্যকর?

পিসিএনএল (Percutaneous Nephrolithotomy) একটি অপেক্ষাকৃত জটিল পদ্ধতি, যেখানে পিঠের দিক দিয়ে একটি ছোট ছিদ্র করে সরাসরি কিডনির ভেতরে ক্যামেরা (নেফ্রোস্কোপ) প্রবেশ করানো হয়। তারপর লেজার বা আল্ট্রাসাউন্ড দিয়ে বড় পাথর (২ সেন্টিমিটারের বেশি) ভেঙে টুকরো টুকরো করে বের করে আনা হয়। এই পদ্ধতিটি বড়, জটিল বা শক্ত পাথরের জন্য প্রথম পছন্দ, কারণ ইউআরএস দিয়ে এত বড় পাথর পুরোপুরি ভাঙা সম্ভব নয়। পিসিএনএল-এ সাধারণত ১-৩ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়।

ইউআরএস বনাম পিসিএনএল: কোনটা আপনার জন্য সঠিক?

দুটি পদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য বোঝা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ পাথরের আকার ও অবস্থানের উপর নির্ভর করে চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন। নিচের টেবিলটি দেখলে আপনি সহজেই বুঝতে পারবেন কোন পদ্ধতি কখন বিবেচনা করা হয়।

বিষয় ইউআরএস (ইউরেটেরোস্কোপি) পিসিএনএল (পারকিউটেনিয়াস নেফ্রোলিথোটমি)
পাথরের আকার ছোট-মাঝারি (২ সেমি পর্যন্ত) বড় (২ সেমি+) বা জটিল
প্রবেশপথ মূত্রনালী দিয়ে (প্রাকৃতিক পথ) পিঠের ছিদ্র দিয়ে (সরাসরি কিডনি)
হাসপাতালে থাকা ডে-কেয়ার বা ১ দিন ১-৩ দিন
পুনরুদ্ধার দ্রুত (১-২ দিনে স্বাভাবিক) ধীর (৩-৭ দিন)
জটিলতার ঝুঁকি মূত্রনালীতে আঘাত, সংক্রমণ রক্তপাত, কিডনিতে ছিদ্র, সংক্রমণ

অপারেশনের আগে-পরে কী করবেন? প্রস্তুতি ও পুনরুদ্ধারের সময়

অপারেশনের আগে: রক্ত পরীক্ষা, প্রস্রাব পরীক্ষা ও ইমেজিং (সিটি স্ক্যান বা আল্ট্রাসাউন্ড) করা হয়। চিকিৎসক রক্ত পাতলা করার ওষুধ বন্ধ রাখতে বলতে পারেন। অপারেশনের আগের রাত থেকে উপবাস থাকতে হবে।

অপারেশন পরবর্তী: সাধারণত প্রস্রাবে হালকা রক্তপাত, জ্বালা বা ব্যথা থাকতে পারে—এটি স্বাভাবিক। ইউআরএস-এর পর একটি স্টেন্ট (পাতলা টিউব) মূত্রনালীতে রাখা হতে পারে, যা কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর সরানো হয়। পিসিএনএল-এর পর কিডনির ছিদ্রের জায়গায় হালকা ব্যথা থাকতে পারে।

কখন ডাক্তার দেখাবেন: যদি জ্বর আসে, তীব্র ব্যথা হয়, প্রচণ্ড রক্তপাত হয় বা প্রস্রাব করতে না পারেন—তবে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে যান।

বাংলাদেশে ইউআরএস ও পিসিএনএল-এর খরচ কত? (আনুমানিক বাজারদর)

বাংলাদেশের বেসরকারি হাসপাতালে এই পদ্ধতিগুলোর খরচ বিভিন্ন বিষয়ের উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়—যেমন সার্জনের ফি, হাসপাতালের ক্যাটাগরি, কেবিন বা আইসিইউ প্রয়োজন, এবং অপারেশনের জটিলতা। সরকারি হাসপাতালে খরচ অনেক কম হতে পারে, তবে অপেক্ষার সময় দীর্ঘ হতে পারে। নিচে বেসরকারি হাসপাতালের আনুমানিক খরচ দেওয়া হলো (খরচ পরিবর্তনশীল, চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের আগে হাসপাতালে যোগাযোগ করুন)।

খাত আনুমানিক খরচ (বিডিটি) মন্তব্য
ইউআরএস (ডে-কেয়ার) ৳৪০,০০০ – ৳৮০,০০০ সার্জন ফি, অ্যানেসথেসিয়া ও হাসপাতালের কেবিন ভাড়া অন্তর্ভুক্ত; স্টেন্ট থাকলে অতিরিক্ত খরচ হতে পারে।
পিসিএনএল (১-৩ দিন) ৳৮০,০০০ – ৳১,৫০,০০০ বড় পাথর বা জটিল ক্ষেত্রে খরচ বাড়তে পারে; আইসিইউ প্রয়োজন হলে আরও বেশি।
সার্জনের ফি (আলাদা) ৳১৫,০০০ – ৳৪০,০০০ অভিজ্ঞতা ও খ্যাতির উপর নির্ভর করে।
সরকারি হাসপাতাল ৳৫,০০০ – ৳২০,০০০ (আনুমানিক) খরচ কম, তবে অপেক্ষার সময় ও সীমিত সুবিধা বিবেচনা করতে হবে।

মনে রাখবেন: উপরোক্ত খরচ শুধুমাত্র ধারণা দেওয়ার জন্য। প্রকৃত খরচ হাসপাতাল, সার্জন, রোগীর শারীরিক অবস্থা ও জটিলতার উপর নির্ভর করে পরিবর্তিত হয়। চিকিৎসা শুরুর আগে হাসপাতালের বিলিং বিভাগ থেকে বিস্তারিত জেনে নিন।

পাথর পুনরায় না হওয়ার জন্য করণীয়

পাথর অপসারণের পর পুনরাবৃত্তি রোধ করতে কিছু অভ্যাস মেনে চলা জরুরি:

  • প্রচুর পানি পান: দিনে ২.৫-৩ লিটার পানি পান করুন, যাতে প্রস্রাব পাতলা থাকে এবং পাথর জমতে না পারে।
  • লবণ ও প্রোটিন নিয়ন্ত্রণ: অতিরিক্ত লবণ ও প্রাণিজ প্রোটিন (মাংস, ডিম) পাথর গঠনের ঝুঁকি বাড়ায়।
  • ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার বাদ দেবেন না: দুধ, দই, পনির ইত্যাদি পরিমিত পরিমাণে খেতে পারেন—কিন্তু অতিরিক্ত ক্যালসিয়াম সাপ্লিমেন্ট এড়িয়ে চলুন।
  • চিকিৎসকের পরামর্শ: পাথরের ধরন (ক্যালসিয়াম, ইউরিক অ্যাসিড, সিস্টিন ইত্যাদি) জানতে পরীক্ষা করান এবং সেই অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস ও ওষুধ (যেমন পটাশিয়াম সাইট্রেট) নিন।

বিভাগ অনুযায়ী বিশেষজ্ঞ ইউরোলজিস্ট ডাক্তার খুঁজুন

আপনার নিকটবর্তী ইউরোলজি বিশেষজ্ঞ খুঁজতে নিচের টেবিলটি ব্যবহার করুন। মনে রাখবেন, পাথরের চিকিৎসায় ইউরোলজিস্ট বা জেনারেল সার্জন যিনি ইউরোলজিতে প্রশিক্ষিত, তার পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

বিভাগ ডাক্তার খুঁজুন
ঢাকা ঢাকায় ভেরিফাইড জেনারেল সার্জন ডাক্তার
চট্টগ্রাম চট্টগ্রামে টপ জেনারেল সার্জন ডাক্তার
খুলনা খুলনায় সেরা জেনারেল সার্জন ডাক্তার
রাজশাহী রাজশাহীতে ভেরিফাইড জেনারেল সার্জন ডাক্তার
রংপুর রংপুরে জেনারেল সার্জন বিশেষজ্ঞ
সিলেট সিলেটে টপ জেনারেল সার্জন ডাক্তার
বরিশাল বরিশালে জেনারেল সার্জন ডাক্তার
ময়মনসিংহ ময়মনসিংহে ভেরিফাইড জেনারেল সার্জন ডাক্তার

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন

ইউআরএস বা পিসিএনএল করার সময় কি ব্যথা লাগে? কী ধরনের অ্যানেসথেসিয়া ব্যবহার করা হয়?

দুটি পদ্ধতিই সাধারণত পূর্ণ অ্যানেসথেসিয়ার (জেনারেল অ্যানেসথেসিয়া) অধীনে করা হয়, অর্থাৎ আপনি পুরো প্রক্রিয়ায় ঘুমিয়ে থাকবেন এবং কোনো ব্যথা অনুভব করবেন না। ইউআরএস-এর ক্ষেত্রে কখনো কখনো স্পাইনাল অ্যানেসথেসিয়াও দেওয়া হতে পারে, যেখানে শরীরের নিচের অংশ অসাড় থাকে। অপারেশনের পর হালকা ব্যথা বা জ্বালাপোড়া হতে পারে, যা সাধারণত ব্যথানাশক ওষুধে নিয়ন্ত্রণে থাকে। পিসিএনএল-এর পর কিডনির জায়গায় কিছুটা অস্বস্তি থাকতে পারে, তবে তা দ্রুত কমে যায়। আপনার চিকিৎসক অপারেশনের আগে অ্যানেসথেসিয়ার ধরন ও ব্যথা ব্যবস্থাপনা নিয়ে বিস্তারিত বলবেন।

অপারেশনের পর কতদিন হাসপাতালে থাকতে হয়? কবে স্বাভাবিক কাজে ফিরতে পারি?

ইউআরএস সাধারণত ডে-কেয়ার বা ১ দিনের হাসপাতালে ভর্তি হয়ে করা যায়। বেশিরভাগ রোগীই অপারেশনের দিন বা পরের দিন বাড়ি ফিরতে পারেন। পিসিএনএল-এর ক্ষেত্রে পাথরের আকার ও জটিলতার ওপর নির্ভর করে সাধারণত ২-৩ দিন হাসপাতালে থাকতে হয়। স্বাভাবিক কাজে ফিরতে ইউআরএস-এর পর ৩-৫ দিন, আর পিসিএনএল-এর পর ৭-১০ দিন সময় লাগতে পারে। তবে ভারী কাজ বা পরিশ্রম এড়িয়ে চলতে হবে আরও ২-৩ সপ্তাহ। আপনার শারীরিক অবস্থা ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সময় পরিবর্তিত হতে পারে।

পাথর ভাঙার পর ছোট টুকরোগুলো কীভাবে শরীর থেকে বের হয়? সেগুলো কি নিজে থেকেই বেরিয়ে যায়?

হ্যাঁ, লেজার দিয়ে পাথর ভাঙার পর ছোট ছোট টুকরোগুলো সাধারণত প্রস্রাবের সাথে নিজে থেকেই বেরিয়ে যায়। ইউআরএস-এর সময় চিকিৎসক একটি ছোট জাল বা বাস্কেট দিয়ে বড় টুকরোগুলো সরিয়ে দেন, আর খুব ছোট টুকরা প্রস্রাবের মাধ্যমে বের হয়। পিসিএনএল-এর সময় কিডনিতে একটি ছোট নল (নেফ্রোস্টমি টিউব) রেখে দেওয়া হতে পারে, যা দিয়ে পাথরের টুকরা ও তরল বের করা হয়। কিছু ক্ষেত্রে অপারেশনের পর একটি স্টেন্ট (ছোট নল) মূত্রনালীতে রাখা হয়, যা প্রস্রাবের প্রবাহ ঠিক রাখে এবং টুকরা বের হতে সাহায্য করে। স্টেন্ট সাধারণত কয়েক দিন বা সপ্তাহ পর সরিয়ে ফেলা হয়।

পাথর পুনরায় হওয়া রোধে কী কী খাবার এড়িয়ে চলা উচিত? পানি ছাড়া আর কী করবেন?

পাথরের ধরনের ওপর নির্ভর করে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন করা জরুরি। সাধারণ পরামর্শ হলো: পর্যাপ্ত পানি পান করা (দিনে ২.৫-৩ লিটার), লবণ ও প্রক্রিয়াজাত খাবার কম খাওয়া, এবং প্রাণীজ প্রোটিন (লাল মাংস, চিংড়ি) পরিমিত খাওয়া। ক্যালসিয়ামযুক্ত খাবার (দুধ, দই) পুরোপুরি বাদ না দিয়ে পরিমিত খাওয়াই ভালো, কারণ ক্যালসিয়ামের অভাবে পাথর হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। অক্সালেট সমৃদ্ধ খাবার (পালং শাক, বিট, চকোলেট, চা) বেশি খেলে ক্যালসিয়াম অক্সালেট পাথরের ঝুঁকি বাড়ে। তবে ব্যক্তিগত পাথরের ধরন জানতে ইউরিন ও রক্ত পরীক্ষা করিয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া সবচেয়ে নিরাপদ।

কিডনিতে পাথর থাকলে কি ইউআরএস না পিসিএনএল—কোন পদ্ধতি বেশি নিরাপদ? ডাক্তার কীভাবে সিদ্ধান্ত নেন?

নিরাপত্তা নির্ভর করে পাথরের আকার, অবস্থান, ঘনত্ব ও রোগীর শারীরিক অবস্থার ওপর। সাধারণত ২ সেন্টিমিটারের ছোট পাথর ও মূত্রনালীর নিচের অংশের পাথরের জন্য ইউআরএস বেশি নিরাপদ ও কার্যকর। বড় (২ সেন্টিমিটারের বেশি) বা জটিল কিডনির পাথরের জন্য পিসিএনএল বেশি কার্যকর, কারণ এটি সরাসরি কিডনিতে প্রবেশ করে পাথর পুরোপুরি অপসারণ করতে পারে। চিকিৎসক সিটি স্ক্যান, এক্স-রে ও আল্ট্রাসাউন্ডের মাধ্যমে পাথরের বৈশিষ্ট্য নির্ণয় করে, সাথে রোগীর বয়স, অন্য রোগ (যেমন ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ) ও কিডনির কার্যকারিতা বিবেচনা করে পদ্ধতি নির্বাচন করেন। কোনো পদ্ধতিই সম্পূর্ণ ঝুঁকিমুক্ত নয়, তবে আধুনিক প্রযুক্তি ও অভিজ্ঞ ইউরোলজিস্টের হাতে জটিলতার হার অনেক কম।

তথ্যসূত্র

উপরের তথ্যসূত্রগুলো আন্তর্জাতিক জার্নাল, সরকারি স্বাস্থ্য সংস্থা বা স্বীকৃত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইট থেকে নেওয়া:

Rate this post